অধ্যায় ৩৮: কচ্ছপ নিঃশ্বাস মহামন্ত্র

নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের তলোয়ারবাজ এবং তা মাছ নয় 2316শব্দ 2026-03-06 02:11:59

একদল ছোট ভিখারি রান্নাঘরে দশ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে ব্যস্ত ছিল, অবশেষে এক টেবিল ভর্তি খাবার রান্না করে ফেলল। ছোট ভিখারিদের মুখে লালা ঝরছিল, অথচ কেউই খেতে যায়নি, বরং রান্না করা খাবার তারা ছুরি-নিষ্কলঙ্ক এবং তার সঙ্গীদের সামনে এনে দিল ভোজনের জন্য।
তাদের বয়স অল্প হলেও, তারা বহু আগেই জীবনের উষ্ণ-শীতলতা অনুভব করেছে, মন-মানসিকতা অনেক আগেই পরিপক্ক হয়ে উঠেছে, বরং তাদের বয়সের স্বাভাবিক সরলতা যেন আর নেই।
এটা আনন্দের নাকি দুঃখের বিষয়, কে জানে?
সবাই দুর্বার ক্ষুধায় কাতর, খাবার পেয়ে আর কে-ই বা বিলম্ব করে, পেটপুরে ভোজন শুরু হলো। ঝু ইউনওয়েন মন খারাপ ছিল, সে শুধু খানিকটা খেয়ে নিল।
ছোট ভিখারিরা রান্নাঘরে আরও খাবার তৈরিতে মগ্ন ছিল, এর মধ্যে দু’জন ছোট ভিখারি, হাতে করে এক একটি ভাতের পুঁটলি নিয়ে, খেতে খেতে বাইরে চলে গেল, তারা কোথায় গেল, কেউ জানে না।
কিছুক্ষণ পরে, তারা যখন খাওয়া শেষ করল, তখন চারদিক অন্ধকার নেমে এসেছে।
ছুরি-নিষ্কলঙ্ক অপর টেবিলে হুমড়ি খেয়ে খাওয়া লিউশেং-শিজুবেই-এর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘শিজুবেই, এই আশেপাশে কোথাও কোনো অতিথিশালা আছে?’’
লিউশেং-শিজুবেই খাবার গিলে বলল, ‘‘অতিথিশালায় থাকার কী দরকার? এখানে তো থাকার জায়গা তৈরি আছে! তোমাদের কি টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে?’’
‘‘এখানে থাকব?’’ ছুরি-নিষ্কলঙ্ক বিস্মিত হলো।
‘‘ঠিক তাই,’’ লিউশেং-শিজুবেই বলল, ‘‘আমার সঙ্গে এসো।’’ সে মুখ মোছে, টেবিলের তেলের বাতিটা তুলে নেয়, ঘরের সব থেকে ভেতরের দরজার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে সবাইকে ভেতরে ডেকে নেয়।
চোখে পড়ল, মাঝারি আকারের একটি উঠোন, যেখানে পাঁচ-ছয়টি ঘর রয়েছে।
লিউশেং-শিজুবেই হাসল, ‘‘এতগুলো ঘর তোমাদের থাকার জন্য যথেষ্ট তো?’’
‘‘তুমি কীভাবে জানলে এই সরাইখানার পেছনে ঘর আছে?’’ লি চিয়াং কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল।
লিউশেং-শিজুবেই মুখে গর্বের ছাপ ফুটিয়ে বলল, ‘‘একটু বড়াই করে বলছি, এই সমুদ্রতীর শহরে কোথায় আমি যাইনি?’’ বলেই সে এগিয়ে গিয়ে একটি ঘরে ঢুকে পড়ে।
দেখা গেল, ঘরটি বেশ পরিপাটি, প্রয়োজনীয় সব বাসনপত্র রয়েছে, মোটামুটি ভালোই জায়গা।
ডিং নিঊ সোজাসাপটা মানুষ, অপরের সম্পত্তি দখল করতে তার মনে অস্বস্তি লাগে, সে বলল, ‘‘এভাবে হবে না, আমরা তো অন্যের ঘর দখল করে নিলাম, এতে আর চোর-ডাকাতের সঙ্গে পার্থক্য কী?’’
লিউশেং-শিজুবেই হেসে বলল, ‘‘এই সরাইখানা তো আসলে ইউ জেতিয়েন-দের ছিল না, তারা আগের মালিককে তাড়িয়ে এখানে দখল নিয়েছিল, এখন তোমরা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছ, মানে প্রতিশোধই হলো, এতে দোষের কী আছে?’’

ছুরি-নিষ্কলঙ্ক অবাক হয়ে বলল, ‘‘এভাবে প্রকাশ্যে অন্যের সম্পত্তি দখল, শাসক কি কিছু বলেন না?’’
‘‘এখন তো সর্বত্র যুদ্ধ চলছে, নগরপ্রধান এসব তুচ্ছ বিষয়ে মাথা ঘামান না, তিনি শুধু এটাতে মন দেন।’’ লিউশেং-শিজুবেই বলল, তার বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী ঘষে ইঙ্গিত করল টাকার দিকে।
ঝু ইউনওয়েন মৃদু বিষণ্নতায় বলল, ‘‘একটি শহরের শাসক যদি প্রজাদের সুখ-দুঃখের তোয়াক্কা না করে কেবল নিজের পকেট ভরার চিন্তা করে, তবে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না—প্রজা হলো জল, রাজা হলো তরী; জল তরী ভাসাতে পারে, আবার উল্টেও দিতে পারে। এমন বিশৃঙ্খল সময়ে তার স্থান কোথায়?’’
‘‘ভুল, একেবারে ভুল!’ লিউশেং-শিজুবেই হেসে বলল, ‘‘আমাদের এই নগরপ্রধান অর্থপ্রেমী হলেও, তিনি আসলে সমুদ্রতীর শহরের মানুষের পছন্দের শাসক।’’
‘‘তবে তো আশ্চর্য!’ ঝু ইউনওয়েন বিস্ময় প্রকাশ করল।
লিউশেং-শিজুবেই বলল, ‘‘কারণ তিনি সব টাকা সৈন্যবাহিনী সম্প্রসারণে খরচ করেন। তার বাহিনী শক্তিশালী, অন্য কোনো প্রধান হামলা করতে সাহস পায় না, তাই এই শহর রক্ষা পায় যুদ্ধের আগুন থেকে, আমরাও এত অনাথ এখানে এসে আশ্রয় নিতে পারি।’’
ঝু ইউনওয়েন বলল, ‘‘তাহলে সে ভালো শাসকই তো?’’
‘‘এ শহরের মানুষের কাছে তিনি সত্যিই ভালো শাসক,’’ লিউশেং-শিজুবেই বলল।
ছুরি-নিষ্কলঙ্ক হেসে বলল, ‘‘তবে কি তোমার মনে তিনি ভালো শাসক নন?’’
লিউশেং-শিজুবেই চিন্তা করে বলল, ‘‘তাকে বোঝা সত্যিই কঠিন, আমি তাকে বহুবার দেখেছি, প্রতিবারই তার মুখে হাসি লেগে থাকে, খুবই সদয় মনে হয়, কিন্তু আমার মনে হয় তিনি সহজ মানুষ নন, তার হাসির আড়ালে অনেক কিছু লুকানো আছে।’’
ছুরি-নিষ্কলঙ্ক মৃদু হেসে বলল, ‘‘তুমি তো এখনও ছোট, এসব বোঝো কী করে?’’
লিউশেং-শিজুবেই আপত্তি জানিয়ে বলল, ‘‘আমার বয়স কম হতে পারে, তবে আমি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, কেমন মানুষ আমি দেখিনি? কথায় আছে, হাসির আড়ালে ছুরি, তিনি বাইরে হাসলেও মনে ছুরি লুকিয়ে রাখেন, সুযোগ পেলেই আঘাত হানবেন, আর তুমি বুঝতেও পারবে না কীভাবে মারা গেলে।’’
বলে সে গলায় ছুরি চালানোর অভিনয় করল, সবাই হাসতে লাগল।
লিউশেং-শিজুবেই দেখল সবাই হাসছে, হঠাৎ রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, ‘‘তোমরা আমার কথা বিশ্বাস করো না তো? তাহলে একটা গোপন কথা বলি।’’
লি চিয়াং অবজ্ঞার সঙ্গে বলল, ‘‘তোমার আবার কী গোপন কথা?’’
লিউশেং-শিজুবেই স্বপ্ন দেখার ভঙ্গিতে বলল, ‘‘সমুদ্রের ওপারে রয়েছে দা-মিং সাম্রাজ্য, শোনা যায় সেখানে সোনা ছড়িয়ে আছে, আমাদের নগরপ্রধান বিশেষজ্ঞদের পাঠিয়েছেন লুট করতে...’’
‘‘থামো, এত গোপন কথা তুমি জানলে কীভাবে?’’ ছুরি-নিষ্কলঙ্ক কৌতূহল প্রকাশ করল।

লিউশেং-শিজুবেই গম্ভীরভাবে বলল, ‘‘নিজ কানে শুনেছি, তোমাদের কি মিথ্যা বলব?’’
লি চিয়াং ঠাট্টা করে বলল, ‘‘নগরপ্রধানের প্রাসাদে কি বিশেষজ্ঞ নেই? তুমি একটা বাচ্চা হয়ে এত গোপন কথা শুনলে কেমন করে?’’
লিউশেং-শিজুবেই গম্ভীরভাবে বলল, ‘‘আমাকে ছোট ভাবো না, আমি কিন্তু অদ্বিতীয় কৌশলের অধিকারী।’
‘‘তুমি? সে আবার অদ্বিতীয় কৌশল!’’ লি চিয়াং হেসে উঠল।
দেখল সবাই অবিশ্বাসের চোখে তাকাচ্ছে, লিউশেং-শিজুবেই গোপনে মনোসংযোগ করল, বলল, ‘‘তোমরা চোখ বন্ধ করে দেখো, আমার উপস্থিতি টের পাও কিনা।’’
লি চিয়াং সে কথা মতো চোখ বন্ধ করল, কিছুক্ষণ পরে বিস্ময়ে ‘ঈ’ বলল—লিউশেং-শিজুবেই পাশে থাকলেও তার উপস্থিতি একটুও টের পেল না।
এ রকম কেবল দু’ভাবে সম্ভব, এক, প্রতিপক্ষের কৌশল অনেক বেশি উন্নত; দুই, প্রতিপক্ষের বিশেষ গুণ আছে। লিউশেং-শিজুবেই-এর কৌশল লি চিয়াং-এর চেয়ে ভালো হলে সে এভাবে পালাতে পারত না, তাই দ্বিতীয় কারণটাই সত্য—লিউশেং-শিজুবেই সত্যিই বিশেষ কৌশলের অধিকারী।
লি চিয়াং বিস্মিত হয়ে বলল, ‘‘তুমি কীভাবে করলে?’’
লিউশেং-শিজুবেই গর্বে হাসল, ‘‘এটা আমাকে এক ভবিষ্যৎবক্তা সাধু শিখিয়েছেন, নাম ‘কচ্ছপ-নিঃশ্বাস মহাবিদ্যা’। তিনি বলেছিলেন, আমি মানুষের মাঝে অদ্বিতীয়, একদিন বিশ্বজোড়া খ্যাতি হবে, তাই এই বিদ্যা আমাকে দিলেন, বললেন পাঁচ বছর পর আর ভিক্ষে করতে হবে না।’’
একটু থেমে, লিউশেং-শিজুবেই আপনমনে বলল, ‘‘আরও ছয় মাস, পাঁচ বছর পূর্ণ হবে, দেখা যাক তার গণনা ঠিক ছিল কিনা।’’
লি চিয়াং বিস্মিত হয়ে বলল, ‘‘তথ্য সত্যি?’’
‘‘বিশ্বাস না হলে থাক, ’’ লিউশেং-শিজুবেই রাগী চোখে তাকিয়ে বলল, ‘‘নগরপ্রধানের লোকেরা দা-মিং রাজ্যে গিয়েছিল লুট করতে, জানি না কার মাধ্যমে খবর ফাঁস হয়েছিল, এখন পুরো সমুদ্রতীর শহরের মানুষ তা জানে, ফলে আরো অনেকেই দা-মিং-এ লুট করতে ছুটছে, রাতারাতি ধনী হবার আশায়।’’
ছুরি-নিষ্কলঙ্ক ও তার সঙ্গীরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল, ভাবতেও পারেনি, উপকূলে যারা লুটত, তারা আসলে সমুদ্রতীর শহরেরই মানুষ।