অষ্টাদশ অধ্যায়: নারী সচিব নিয়োগ
নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলল নিকোলাস ওয়েবসাইট। আগের সাফল্যের স্বাদ পেয়ে এবার তারা সংগীতের ক্যাসেট বিক্রির সিদ্ধান্ত নিল। চলচ্চিত্র কোম্পানিগুলো নিকোলাস ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভালো মুনাফা করেছে, এই উদাহরণ সামনে থাকায় সংগীত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করা সহজ হয়ে গেল। গিলি হার্ট নিজে উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন সংগীত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব দিলেন। পাশাপাশি, নিকোলাস ওয়েবসাইট পুরো আমেরিকাজুড়ে চারটি বিশাল গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা করল এবং নিজস্ব লজিস্টিকস কোম্পানি গড়ে তুলতে শুরু করল।
কিন্তু এসব কিছু ধীরে ধীরে করতে হবে, এক লাফে সব সম্ভব নয়। প্রথম গুদামটি হবে লস অ্যাঞ্জেলস শহরতলিতে, এক লাখ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে। শুধু জমি কিনতেই দশ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। নির্মাণ কাজ ১৯৯০ সালে শেষ হওয়ার কথা। সাধারণ গুদাম নয়, নানা আধুনিক প্রযুক্তি, যান্ত্রিক ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সমন্বয়ে বিশাল প্রকল্প এটি!
নিকোলাস ওয়েবসাইট বর্তমানে যে লজিস্টিকস কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছে, তা হলো ফেডারাল এক্সপ্রেস। একজন ই-কমার্স জায়ান্ট হিসেবে নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কোম্পানির স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে!
তবে নিজস্ব লজিস্টিকস কোম্পানি গড়ার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে। নিকোলাস ওয়েবসাইট ও ফেডারাল এক্সপ্রেসের মধ্যে সম্পর্ক বেশ ভালো, তারা যদি জানতে পারে নিকোলাস ওয়েবসাইট নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা করছে, তাহলে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, অর্থ ও পরিসরের সীমাবদ্ধতার কারণে নিকোলাসের লজিস্টিকস কেবল ক্যালিফোর্নিয়াতেই কার্যকর, সারা আমেরিকায় নয়। আর এই সময়ের ফেডারাল এক্সপ্রেস ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোম্পানি, তাদের কার্যক্রম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।
নিকোলাস ওয়েবসাইটের অর্থব্যয় দেখে হেনরি কপালে হাত দিচ্ছিলেন। তবে এখন বড় লোকসান দিয়ে হলেও বাজার দখল করতেই হবে, ই-কমার্স দুনিয়ায় শীর্ষস্থানে টিকে থাকতে হলে। যুক্তরাষ্ট্রে আরও অনেক নিকোলাস-জাতীয় ওয়েবসাইট গড়ে উঠছে, নিকোলাস যদি লড়াই না করে, তাহলে সহজেই ছিটকে পড়বে। একবার পিছিয়ে গেলে আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। ইন্টারনেট জগতে “ম্যাথিউ এফেক্ট” সবচেয়ে স্পষ্ট, শক্তিশালী আরও শক্তিশালী হয়, দুর্বল আরও দুর্বল!
যেমন, কিউকিউ একবার জনপ্রিয় হলে, অন্য সব চ্যাটিং সফটওয়্যার ঝরে পড়ে, কেউ আর তাদের টেক্কা দিতে পারে না। আলিবাবা, টাওবাও—তাদের ইতিহাসও তাই বলে।
নিকোলাস ওয়েবসাইট থেমে গেলে বা উন্নতি না করলে, শিগগিরই কেউ তাদের ছাড়িয়ে যাবে, তারা পিছিয়ে পড়বে, এমনকি ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।
নিকোলাসের ব্যবসা বাড়ছে, হেনরির অধীনে কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে চলেছে, ফলে হেনরি নিজেই হিমশিম খাচ্ছিলেন। গিলি হার্ট তাঁকে পরামর্শ দিলেন একজন ব্যক্তিগত সহকারী নিয়োগের। চিন্তা করে হেনরি বুঝলেন, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। তাই নিকোলাস গ্রুপের পক্ষ থেকে একজন মহিলা সেক্রেটারি নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে, কেন নারী? পুরুষ হলে কি নারী সেক্রেটারি নিতো না?
নিকোলাস গ্রুপ খুব বড় কোনো কোম্পানি নয়, কিন্তু ইন্টারনেটে তাদের সুনাম প্রচুর। বেতন-ভাতা চমৎকার—মাসিক দশ হাজার ডলার, সত্যিকার উচ্চশ্রেণির পেশাজীবী। বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে পড়তেই আবেদনকারীর ঢল নামল। কোম্পানি একত্রে ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করল, হেনরি নিজেই প্রধান পরীক্ষক হিসেবে উপস্থিত হলেন।
আবেদনকারীদের ভিড়ে কেউ সদ্য স্নাতক, কেউ কর্পোরেট পেশাজীবী—কিন্তু পুরো সকাল ইন্টারভিউ নিয়েও হেনরি পছন্দের কাউকে পেলেন না। শুধু দক্ষ হলেই হবে না, দেখতে-শুনতেও মনোরম হতে হবে। হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি থেকে আসা বহু মেয়েই মেধায় অনন্য, কিন্তু চেহারায় বাজিমাত করতে পারলেন না।
হেনরির কিছুটা বাহ্যিক সৌন্দর্যপ্রীতি আছে। ব্যক্তিগত সহকারী যদি দেখতে খারাপ হয়, সেটা মেনে নেওয়া কঠিন।
দুপুরে হেনরি চিনা খাবার খেতে বাইরে যাচ্ছিলেন, তখনই এক তরুণী তাড়াহুড়ো করে এসে হেনরিকে ধাক্কা দিল। সে বারবার মাথা নত করে ক্ষমা চাইল। তার হাত থেকে পড়ে গেল নিয়োগ বিজ্ঞাপনের পোস্টার। হেনরি দেখেই বুঝলেন, এই তরুণীই চাকরির আশায় এসেছে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তুমি কি সাক্ষাৎকার দিতে এসেছ?’’
তরুণী কিছুটা লজ্জা নিয়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ... দুঃখিত, ইন্টারভিউ মিস হয়ে যাবে ভেবে খুব তাড়াহুড়ো করছিলাম, এজন্যই এই ভুল...’’
হেনরি জানালেন, ‘‘সকালবেলার ইন্টারভিউ শেষ, এখন মধ্যাহ্নভোজের সময়। দুপুরের ইন্টারভিউ শুরু হবে দু’টায়।’’
তরুণী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল—‘‘ওহ, অনেক ধন্যবাদ! আমি তো ভাবছিলাম আর পারব না।’’
‘‘কিছু না...’’ হেনরি মাথা নাড়লেন, তরুণীর পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।
দুপুরের খাবার শেষে হেনরি ফিরে এসে দেখলেন, সেই তরুণী হলঘরের এক কোণায় একা বসে আছে, হাতে রেজ্যুমে, চেহারায় উৎকণ্ঠার ছাপ। হেনরি কিছুক্ষণ ভেবে তার কাছে গেলেন।
‘‘তুমি দুপুরের খাবার খেয়েছ?’’ হেনরি জিজ্ঞেস করলেন।
তরুণী চমকে তাকিয়ে দেখল, এ তো সেই তরুণ, যাকে সে ধাক্কা দিয়েছিল। ‘‘না, এখন খিদে নেই।’’
‘‘তুমি খুব টেনশনে আছ?’’
‘‘হ্যাঁ, এটাই আমার জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ।’’
হেনরি মনোযোগ দিয়ে দেখলেন, মেয়েটির পোশাক-আশাক বেশ পুরনো, সাদামাটা, দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। ঢিলেঢালা জামার ভেতরে তার গঠন বোঝার উপায় নেই। দূর থেকে দেখলে কোনো আকর্ষণ নেই, কিন্তু কাছে এলে তার ত্বক বরফের মতো ধবধবে, চেহারায় মুগ্ধতা। তবে সবচেয়ে আশ্চর্য, দেখতে মনে হয় ষোলোও পেরোয়নি। সম্ভবত হাইস্কুলও শেষ হয়নি, তাহলে সে এখানে কেন?
এই চাকরির জন্য তো উচ্চশিক্ষিত, ব্যবসায়িক মেধাসম্পন্ন কাউকেই খোঁজা হচ্ছে!
হেনরি অবশেষে প্রশ্ন করলেন, ‘‘তুমি কি ষোলোও পূর্ণ করোনি? এত ছোট বয়সে আবেদন করছো?’’
‘‘আমি... আমি আগামী মাসেই ষোলো হবো,’’ তরুণী আত্মপক্ষ সমর্থন করল।
‘‘এই চাকরিতে তো সমাজের সেরা শিক্ষিতরা আসে, নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তরুণ-তরুণীরা। তুমি কীভাবে এখানে?’’
তরুণী দৃঢ়স্বরে বলল, ‘‘বেতন অনেক বেশি! আমার এখন খুব টাকার দরকার, তাই চেষ্টা করতেই এসেছি।’’
তরুণীর মধ্যে হঠাৎ এমন মজবুত সংকল্প দেখে হেনরির কৌতূহল বাড়ল—‘‘তুমি টাকার এত প্রয়োজন কেন?’’
তরুণীর গলা কেঁপে উঠল, কথা থেমে গেল।
হেনরি বিস্মিত হলেন, বুঝলেন নিশ্চয় কোনো লুকানো কষ্ট আছে।
‘‘তুমি চাইলে তোমার সিভি দেখতে পারি?’’ হেনরি বললেন।
‘‘অবশ্যই...’’ তরুণী রেজ্যুমে এগিয়ে দিল।
হেনরি খুলে দেখলেন—এসএটি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর, জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে প্রথম স্থান, তারপরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ... মেয়েটি তো এক কথায় জিনিয়াস!
‘‘তুমি হার্ভার্ডে ভর্তি হলে গেলে না কেন?’’
তরুণী কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখ নিচু করে বলল, ‘‘আমার মা অসুস্থ, আমাকে বাড়িতে থেকে তার দেখাশোনা করতে হয়।’’
সবকিছু পরিষ্কার। মেয়েটি নিজের স্বপ্ন ছেড়ে মায়ের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে। তার এই আত্মত্যাগ দেখে হেনরির মনে শ্রদ্ধা জাগল। মেয়েটি যে মায়ের চিকিৎসার জন্যই অর্থ চায়, তা অনুমান করতে কষ্ট হলো না। হেনরির মনে সহানুভূতি জেগে উঠল, বললেন, ‘‘ভালো মানুষদের ঈশ্বর সাহায্য করেন। তোমার মা নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠবেন!’’