দ্বিতীয় অধ্যায়: সাইবেরিয়ায় আশ্রয়
প্রশ্ন: ভিনগ্রহবাসীদের কি মানবাধিকার আছে?
উত্তর: যখন বিশাল যুদ্ধজাহাজ পৃথিবীর কক্ষপথে দাঁড়িয়ে থাকে, সমস্ত কামান মুখ করে মাটির দিকে তাক করা, তখন ভিনগ্রহবাসীর মানবাধিকার ভীষণভাবে নিশ্চিত! এমনকি রাজ্যক্ষমতা নিয়েও আলোচনা করা যায়। কিন্তু ভিনগ্রহ থেকে কেউ যদি একা এসে পড়ে, তখন মানবাধিকার তো দূরের কথা, তার অবস্থা হবে পরীক্ষাগারের সাদা ইঁদুরের মতোই।
এটাই হল ‘এনিউনো ওডিন’ ছদ্মনামে পরিচিত সেই পাড়াপারের যাত্রীটির বর্তমান অবস্থা—একটি অন্ধকারে ঢাকা, সম্পূর্ণ বন্ধ ঘরে বন্দি। পরিবেশ মোটেও আরামদায়ক নয়; কেবল একটি বিছানা, একটি ধোয়ার বেসিন আর একটি বসার টয়লেট আছে। কোনো কারাগারের নির্জন কক্ষের পরিবেশের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। তবে সাধারণ কারাগারে এত যত্নে সাদা রং করা হয় না, সাদা চাদর দেওয়া হয় না, স্টিলের বেসিন আর টয়লেট এভাবে ঝকঝকে করা হয় না।
ঘরটি এমনকি তার আগের জীবনের ত্রিশ বছরের ঋণে কেনা ফ্ল্যাটের থেকেও বড়! কিন্তু ভেতরে কোনো সাজসজ্জা নেই, কোনো বিভাজন নেই—একেবারে কাঁচা ঘরের মতো। এমনকি এখানে আলো জ্বালানো বা নিভানোর অধিকারও এনিউনো ওডিনের নেই। ঘরের আলো নিয়ন্ত্রণ করে বাইরে থাকা সাদা এপ্রোন পরা গবেষকরা।
ছোটবেলা থেকে তার পোশাক ছিল মাত্র দুই রকম—একটা সম্পূর্ণ অনাবৃত, আরেকটা সাদা সোজা জামা, যা হাসপাতালের রোগীর পোশাকের মতো, শুধু পেছনে খোলা নয়। শিশু অবস্থায় কেউ দুধ খাওয়াতে সহায়তা করত, কিন্তু দুধ ছাড়ার পর খাবার একঘেয়ে পুষ্টিকর খাদ্য—না পেট ভরে, না মুখে স্বাদ লাগে।
ঘর এত পরিষ্কার যে, ক্ষুধা মেটাতে তেলাপোকা, ইঁদুর, টিকটিকি কিছুই ধরার উপায় নেই। কেবলমাত্র পাওয়া যায়, টয়লেটে ফ্লাশ না দেওয়া মল… কিন্তু এই চরম পরিস্থিতিতেও সে নিজেকে সংযত রাখে; অন্তত ফ্লাশের সুইচটা নিজে টিপতে পারে, অন্যদের হাতে সেটাও যায়নি।
তিন বেলা খাবার আর আলো জ্বালানো-নেভানোর মধ্য দিয়েই সময়ের হিসাব চলে; কোনো ঘড়ি, ক্যালেন্ডার বা দিনের চিহ্ন নেই। ঘরের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত, ঋতু পরিবর্তনের কোনো অনুভব নেই। পাতলা জামা ও কম্বলেই শীত-গরমের কষ্ট সহ্য হয়।
অসুস্থতার কথা বলতে গেলে, এই অনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সে একবারও অসুস্থ হয়নি; বড় বা ছোট কোনো রোগ হয়নি। বরং, সবসময়ই আধা-পুষ্টিহীন, আধা-স্বাস্থ্যহীন অবস্থায় বেঁচে আছে। অন্যদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, শুধু মাঝে মাঝে রক্ত নেওয়া বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। সামনে এলেও তারা খুব সাবধানে কথা বলে, অপ্রয়োজনীয় তথ্য ফাঁস করে না।
কথা প্রসঙ্গে বলা যায়, ঘর পরিষ্কার করা হয় তখনই, যখন সে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বাইরে যায়। সে সময় কোনো চিহ্ন বা জিনিস রেখে গেলে, এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে রেখে যাওয়া খাবারও সরিয়ে ফেলা হয়—হয় গবেষণার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, নয়ত ফেলে দেওয়া হয়। কয়েকবার এমন হলে, সে এসব চেষ্টা বাদ দেয়।
এই অদ্ভুত পরিস্থিতির অর্থ প্রথমে এনিউনো ওডিন বুঝতে পারেনি—কেউ তার সঙ্গে কথা বলছে না, তথ্য জানার চেষ্টা করছে না—কেন? পরে সে বুঝল, যোগাযোগ তখনই হয়, যখন বিপরীতে প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে। একটি শিশুর মনে কী-ই বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকতে পারে!
তখন যদি প্রশ্ন করা হয়, মহাকাশযানে শিশুর অবস্থা কেমন ছিল, অথবা তার নিজ গ্রহের প্রযুক্তি কেমন—এসব উত্তর কি শিশুর স্মৃতি থেকে পাওয়া সম্ভব? আসলে তার একমাত্র মূল্যবান জিনিস হচ্ছে, যে যানটি তাকে পৃথিবীতে এনেছে এবং সে নিজেই।
তাই সবাই তার সঙ্গে যোগাযোগে প্রবল সতর্কতা অবলম্বন করে। কেউ কেউ সম্পূর্ণ রক্ষাকবচ পরে তার কাছে আসে; যারা কেবল সাদা এপ্রোন পরে, তারা কাচের ওপাশ থেকেই দেখে। কখনো সে ভাবত, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানায়, সে লাল পতাকার নিচে জন্মেছে, মহামানব আর শান্তিপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন দেখে…
কিন্তু যখন ভিনগ্রহ থেকে পার হয়ে এসে পৃথিবীতে পড়ে, তখন এই পৃথিবী তার চেনা পৃথিবী কিনা, সন্দেহ হয়। চারপাশে স্লাভ জাতিসত্তার মানুষ, ভাষাও রুশের মতোই, ইংরেজি বা জাপানি বা জার্মান নয়। তবুও, যদি কখনো ভুল করে বলে ফেলে সে কীভাবে পৃথিবীর খবর পেল, তাহলে গবেষকদের ছুরির নিচে পড়া শুধু সময়ের ব্যাপার।
কারণ এই বিচ্ছিন্ন পরিবেশেও যদি সে বাইরের পৃথিবীর খবর জানার উপায় রাখে, তাহলে সবাই কারণ খুঁজবে, ভুল-সঠিক যাই হোক। ভুল বললে, ভুল নাম বললে, dissect না করেও উপায় থাকবে না।
এমন কথা আছে, মৃত ভিনগ্রহবাসীই ভালো ভিনগ্রহবাসী। শান্তিপূর্ণ সমাজে সরকারি শক্তিকে চ্যালেঞ্জ না করাই বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। অভ্যস্ত গরু-ঘোড়ার মতো জীবন, যেখানে অফিসের কাজের পরিশ্রমে ৯৯৬ থেকে ০০৭-এ পৌঁছে যায়, সেখানে ফরাসিদের মতো বিদ্রোহী রোমান্টিকতা আসার প্রশ্নই ওঠে না। জীবনভর খেটে শেষে বোঝা যায়, কাজের চেয়ে কোনো বড়লোক খালার আশ্রয়ই শ্রেয়।
এখন, যদিও কোনো খালা নেই, নেই কোনো অ্যানিমে, নেই কোনো গেম, নেই ফোনে চ্যাট, নেই কোমল পানীয় বা কোনো ভাজাপোড়া, তারপরও অভিযোগ করার কিছু নেই। সে ভাবত, এই বিচ্ছিন্নতা আর রক্ত পরীক্ষার জীবন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলবে। অথচ, যখন তার শরীরের বৃদ্ধি থেমে যায়, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়।
গবেষকদের আচরণে কোনো বাঁধা উঠে যায়—তারা ভিনগ্রহবাসীর ওপর পরীক্ষা চালাতে শুরু করে। কেটে, ছিঁড়ে, ফুটো করে, পুড়িয়ে—যে সব নির্যাতন শুধু শুনেছে, কিংবা কল্পনাও করতে পারেনি, তা প্রয়োগ হতে থাকে। নানা ধরনের যন্ত্র দিয়ে শরীরের সহ্যশক্তি, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখা হয়।
তড়িৎ-শাস্তিও চলে—তাদের লক্ষ্য শুধুই কত ভোল্টেজে শরীর পুড়বে, বা অজ্ঞান হবে। প্রথমদিকে আঘাত ছিল হালকা, হাত-পা, শরীরের নানা অংশে চলত। পরে তা বাড়তে থাকে, এমনকি হাত-পা ভেঙে ফেলে, কেবল হাড়ের সেরে ওঠা দেখতে।
একজন অভ্যস্ত গরু-ঘোড়া, পাড়াপারের যাত্রী, এসবের মুখোমুখি হয়নি কখনো। আগে যা সহ্য করেছে, তা কেবল মানসিক চাপ, ক্লান্তি, জীবনের উদ্বেগ—এখানেই সব।
এখন ফিরে তাকালে, আগের সেই মানসিক চাপ কিছুই না। অন্তত মনটা প্রশান্ত রেখে, সহ্য করে বেঁচে থাকা যেত। কিন্তু শরীরের ওপর সরাসরি নির্যাতন—এটা একেবারেই আলাদা!
এবং আঘাত যত বাড়ে, মনে হয়, একসময় তারা হাত-পা কেটে ফেলবে, অথবা কোনো অঙ্গ বের করে নেবে—এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিংবা শরীরে নানা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দিয়ে পরীক্ষা চালাবে।
শেষ পর্যন্ত, হয় তাকে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত নমুনা, নয়তো কাটা টুকরো করে সংরক্ষণ করা হবে। সবচেয়ে দুঃখজনক, এই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারও তার থাকবে না।
তবু বলা কঠিন, বেড়ে ওঠার সময়কার একাকিত্ব বেশি কষ্টদায়ক, নাকি এখনকার অবিরাম শারীরিক নির্যাতন। অন্তত টম হ্যাঙ্কসের ‘কাস্ট অ্যাওয়ে’ সিনেমায় একটা বল ছিল, নাম ‘উইলসন’। তার তো কিছুই নেই।
আগের জীবনের স্মৃতি, কিছু সিনেমা, উপন্যাস, সংগীত—এসবই মানসিক অবলম্বন, না হলে পাগল হয়ে যেত। কিন্তু এখন এই শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে, মানসিক অবস্থা এমনিতেই ভেঙে পড়ার পথে।
এতদিন পড়াশোনা করে, পরিশ্রম করে সমাজের চাকায় গরু-ঘোড়া হয়ে জীবন কাটিয়ে, শেষতক এই শাস্তি—এটাই কি নিয়তির বিচার? তাহলে কি পূর্বজন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে এমন অনিবার্য কষ্ট?
কতদিন ধরে এই জগতে আছে, এনিউনো ওডিন জানে না। কেবল জানে, একদিন আলো আর নিভলো না, খাবারও আর এলো না। যেন কেউ তাকে ফেলে রেখে চলে গেছে।
জলাধারের পানিতে পানি থাকলেও, অন্য কোনো খাবার না থাকায়, দীর্ঘদিনের অপুষ্ট ও নির্যাতিত দেহে ভয়ানক ক্ষুধা চেপে ধরে। হাতে তখনও প্লাস্টার বাঁধা। সারাদিনের আলোয় ঘুমানোর উপায় নেই; অতিরিক্ত মানসিক ক্লান্তি শরীরকে আরও অসহায় করে তোলে।
এমন সময়, মন আকুল হয়ে চায়, আগেকার সেই নির্যাতনের দিনগুলোই যেন ফিরে আসে। যদি কেউ শুনত, তাহলে সে চিৎকার করে বলত, ‘মেরে ফেলো, কেটে ফেলো, শুধু শেষবার পেট ভরে খেতে দাও।’ এই ঘরে ঘাসের শিকড়, গাছের ছাল, এমনকি মাটি কিছুই নেই খাওয়ার মতো।
এ পর্যায়ে এসে, তার মনে হয়, নিজের শরীরের মাংস খাওয়া যায় কি না। কিন্তু শুকনো হাত-পায়ে মাংসই বা কতটুকু, কামড় দেবার শক্তিও নেই, চাইলেও খেতে পারবে না।
হঠাৎ করেই চিন্তা ছিন্ন হয়, অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। হৃদস্পন্দন, শ্বাস—সব আস্তে আস্তে কমে আসে।
এইভাবে চলতে চলতে, অবশেষে হৃদয় থেমে যায়, শ্বাসও বন্ধ হয়ে যায়। যা সামান্য স্বস্তি, তা হলো—অজ্ঞান হয়েই মরে যায়, ধীরে ধীরে মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করতে হয় না।
পূর্বজন্মে তো অনেক ভালো ছিল। যখন অনুভব আসে, তখনই সব শেষ—কিছু বোঝার আগেই সব চুকে যায়।
এই জীবনের শেষ স্মৃতি শুধু একটাই—‘খুব ক্ষুধা লাগছে’।